May 7, 2026, 1:40 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
আগামীকাল ৮ মে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ইতোমধ্যেই পরিণত হয়েছে এক বর্ণিল উৎসব প্রাঙ্গণে। পদ্মাপাড়জুড়ে বইছে রবীন্দ্রচেতনার আবহ; চারদিকে চলছে সাংস্কৃতিক মহামিলনের প্রাণবন্ত প্রস্তুতি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালাকে ঘিরে কুঠিবাড়ি এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে সাজসজ্জা, ব্যস্ততা ও উচ্ছ্বাসের অনন্য সমাহার।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নীতি ও কৌশল বিষয়ক উপদেষ্টা ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. জাহেদ উর রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন।
জাতীয় পর্যায়ের এ আয়োজন ঘিরে পুরো কুষ্টিয়াজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর আবহ, আর রবীন্দ্রপ্রেমীদের পদচারণায় ধীরে ধীরে মুখর হয়ে উঠছে ঐতিহ্যের এই প্রাঙ্গণ।
বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনের অবিনাশী প্রতীক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের সঙ্গে শিলাইদহের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা এই কুঠিবাড়িতেই তিনি রচনা করেছিলেন বহু কবিতা, গান, ছোটগল্প ও চিঠিপত্র। সোনার তরী, চিত্রা, ক্ষণিকা কিংবা অসংখ্য রবীন্দ্রসংগীতের সৃষ্টির পেছনে শিলাইদহের প্রকৃতি ও মানুষের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। তাই প্রতি বছর তাঁর জন্মবার্ষিকীতে শিলাইদহ যেন ফিরে পায় এক ঐতিহাসিক প্রাণচাঞ্চল্য।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তিনদিনের এই আয়োজনে থাকবে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনা, নৃত্যনাট্য, আবৃত্তি, চিত্রপ্রদর্শনী এবং লোকজ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। দেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, আবৃত্তিকার, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নেবেন অনুষ্ঠানে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের কেন্দ্রস্থল রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি এলাকাজুড়ে চলছে সাজসজ্জা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি। দর্শনার্থীদের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে অস্থায়ী মঞ্চ, বসার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা বেষ্টনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরও কাজ করছে সমন্বিতভাবে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে নতুন উদ্দীপনা। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষ শিলাইদহে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. সরওয়ার মুর্শেদ মনে করেন, বর্তমান সময়ে যখন সমাজ নানা বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও মূল্যবোধের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শন নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর সাহিত্য ও গান এখনো মানুষকে অসাম্প্রদায়িকতা, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। তাই জন্মবার্ষিকীর এই আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক শেকড়ের পুনরাবিষ্কারও।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌফিক বিন হাসান জানান, জাতীয় পর্যায়ের এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অতিথি আপ্যায়ন, দর্শনার্থীদের সুবিধা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের সব বিভাগ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে।”
পদ্মার বাতাস, কুঠিবাড়ির নিস্তব্ধতা আর রবীন্দ্রস্মৃতির আবহে আগামী ৮ মে শিলাইদহ আবারও হয়ে উঠবে কবিগুরুর চেতনায় আলোকিত এক সাংস্কৃতিক তীর্থভূমি। সেখানে কবির গান, কবিতা ও দর্শনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম খুঁজে নেবে বাঙালির চিরন্তন আত্মার স্পন্দন।